পরদিন আমাকে জেলে চালান দেওয়া হলো।

হঠাৎ করে দেখি, আমার ডান হাতে একটা লাঠি প্রচন্ড গতিতে আঘাত করে। আমি ডানদিকে ফিরতেই দেখতে পেলাম একজন কনস্টবল আমাকে আঘাতটা করেছেন। আমি তাকে কোন কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই, ডানদিক থেকে আরো কয়েকজন এসে আমাকে এলেপাতাড়ি মারতে থাকে। এলোপাতাড়ি বললে ভুল হবে, কারণ সবাই আমাকে মূলত বামহাটুতেই মারে। একসময় হাটুতে আর বল পাইনা। বসে পড়ি। এরা যেনো আরো বেশি সুযোগ পেয়ে গেলো।আমি যেনো ফুটতে থাকা কড়াই থেকে জ্বলন্ত অগ্নিকুন্ডে লাফ দিলাম। প্রথমে তো আমাকে লাঠি দিয়ে মেরেছিলো। এবার তো দেখি বন্দুকের বাট দিয়ে মারছে। হঠাৎ পায়ের উপর আজাব বন্ধ হলো। (এক পুলিশ কনস্টেবলের কাছে পরে জেনেছি যে, মারতে মারতে বন্দুকের বাট টাই ভেঙ্গে গেছে তাই আর মারে নি)।আমি হাফ ছেড়ে বাচঁলাম আর হয়তো মারবে না। কিন্তু এবারে যেটা দেখলাম সেটা এখনও চোখের সামনে স্পষ্ট ভাসে। ওদের একজন আমার মাথা ধরে রেখেছে আরেকজন আমাকে মাথায় ঠিক কপাল বরাবর আঘাত করছে, শরীরে যতটুকু শক্তি ছিলো তা দিয়ে একটু সরতে চেষ্টা করলাম। আঘাতটা জায়গামতে লাগেনি। তবে চোখের নিচে একেবারে কালশিটে এনে দেয়। অনেকদিন ছিলো ঐ দাগটা, এখনও খেয়ার করলে দেখি। কখন অজ্ঞান হয়ে যায় বুঝতে পারিনি। পাশ থেকে কার আওয়াজ শুনে জ্ঞান ফিরে আসে বুঝতে চেষ্টা করে, দেখি তিনি থানার ওসি। কনস্টেবলদেরকে বলছে কাকে মারছো তোমরা? চেনো এটা কে? আমি দুঃখেও হাসতে চাইলাম। এই লোকটা এরা যখন আমাকে মারছে তখন পঞ্চাশ গজের ভিতরে ছিলো । আর এখন বলছে তোমরা কাকে মারছো। যাই হোক , তারা আমাকে দাড় করালো। ওসি সাহেব আমাকে শান্তনা দিয়ে বললেন আপনি অস্থির হবেন না, এরা আর আপনাকে কিছু করবে না। আমি ওনাকে বললাম “আপনার এই কনস্টেবলটা( ওনার নিরাপত্তার জন্যই নামটা অনুল্লেখ রাখলাম)আমার চোখে চোখ রেখেই মাথায় বাড়ি মারছে। আমার চোখের অবস্থা দেখেন।” ওসি সাহেব কিছু বললেন না। আমিও আর কিছু বললাম না। তিনি আমাকে গাড়িতে উঠার জন্য বললেন । আমি বললাম আমি ক্যাম্পাসের মুল রাস্তা বেয়েই যাবো। তিনি বললেন, না আপনাকে আমরা এই মাঠের মাঝখান দিয়েই নিয়ে যাবো। আমি আর কোন কথা না বাড়িয়ে এগিয়ে চললাম। গাড়িতে উঠার সময় ডিউটি অফিসারকে একজন এস আই কে বলতে শুনলাম, মামলার এজাহারে লিখতে হবে, পালানোর সময় গাছের সাথে বাড়ি খেয়ে চোখে আঘাত পায়। আমি একটা শুষ্ক হাসি হাসলাম। এরপর থানায় নিয়ে আমাকে হাজতে নিয়ে যাওয়া হলো। সেখানে আমাদের শহর আমীর,( Abdullah Al Ragib)রাগীবের আব্বা , আবু তাহের চৌধুরীকে দেখলাম। তিনি আমার দিকে এমনভাবে তাকালেন , সেটা আমি এখনও ভুলতে পারিনি। তাঁর সে চাহনিতে রাজ্যের প্রশ্ন, তিনি যেনো স্রষ্টার কাছে জানতে চাইছিলেন , আমাদের কি অপরাধ? প্রথমে তাঁর সাথে একই সেলে দিতে চেয়েছিলো , কিন্তু পরক্ষণে কি ভেবে আমাকে পরে আলাদা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। সেলে ঢুকে, প্রথমেই ফ্রেশ হয়ে নিলাম। অযু করার সময় নাকে পানি দিতে জমাট বাধা রক্তের কয়েকটা টুকরা নাক বেয়ে পড়লো। আল্লাহ , এতো গুলো রক্ত নাক বেয়ে পড়েছিলো? কাস্টুডিতে থাকার সময় প্রায় কয়েকদিন পরপরই রক্ত যেতো। পরে আল্লাহ ঠিক করে দিয়েছেন। যাহোক, ফ্রেশ হয়ে নামাজ পড়তে দাড়ালাম, রুকুতে যাওয়ার সময়ই বুঝতে পারলাম ঘটনা কি হয়েছে। পা কোনমতেই আর সোজা করতে পারছি না, শেষে বসেই ২ রাকাত নামাজ শেষ করলাম। এখন নিজের দিকে চোখ বুলালাম। ডানহাতটা কনুই বরাবর প্রচন্ড ফুলে গিয়েছে, বামহাটুটার সামনে প্যান্ট ছিড়ে গিছে, রক্ত বের হযেছিলো, জমাট বেধে গেছে, বামহাটু ভিতরের দিকে কালো হয়ে গিয়েছে। যাই হোক , বিশ্রাম নিতে চেষ্টা করলাম্ দুপুরের দিকে এক ভাই , যিনি কোর্টে মুন্সীগিরি করেন , খাবার দিয়ে গেলেন, অনেকেই দেখা করতে চাচ্ছেন, কিন্তু সবাইকে ওসি সাহেবের নির্দেশে আমার সাথে দেখা করতে দেওয়া হলো না। আড়াইটার দিকে আমার দুইজন ক্লাসমেট/বন্ধু একজন পুলিমকে ৩০০ টাকা দিয়ে ম্যানেজ করে আমার সাথে দেখা করতে আসে। আমার সাথে কথা শেষ না হতেই ওসি এসে পৌছান। তিনি তাদের দু’জনকেও আমার সাথে লকাপ করে দেন। বেচারারা অনেক অনুনয় করেও রেহাই পেলো না। আমার সাথে লকআপ থাকা অবস্থায় তাদেরকে শান্তনো দেয়ার চেষ্টা করলাম। কিন্তু কতটুকু আর শান্তনা দিবো? শেষে, পাচটার দিকে যখন আবার ওসি সাহেব আসেন তখন তার সাথে আমি কথা বলে বোঝাতে চেষ্টা করি যে ,এরা আমাদের ছেলে না, আমার সাথে টার্মপেপারের ব্যাপারে কথা বলতে এসেছে। আপনি এদেরকে ছেড়ে দেন। তিনি কিছুক্ষণ ওয়াজ করে ছেড়ে দিলেন। আমাকে ওরা এরেস্ট করে সাড়ে এগারোটার দিকে, কিন্তু এখনও কোন ধরণের অভিযোগ দেখাতে পারেনি। আমি আগের মামলাগুলোতে জামিনে আছি, গতবারে প্রায় সাতমাস জেলে ছিলাম, এটাও ওসি জানতো। তো তিনি বুঝতে পারছেন না , আমাকে কোন মামলায় চালান দিবেন। সন্ধ্যা ছয়টার দিকে নতুন নাটক শুরু হলো। কিছুক্ষণ পর পর কয়েকজন এস আই আরো কয়েকজন সিপাহী নিয়ে এসে আমার খোজ করে। সবাই জিজ্ঞেস করে আপনি ওসি সাহেবের ড্রাইভারকে মারলেন কেন, আমি যেনো আসমান থেকে পড়ি, প্রথম গ্রুপ জানালাম আমি মারিনি। তারা বিশ্বাসই করতে চাইছে না। একজন তো আমাকে বলেই ফেললো, তোমরা শিবিরের ছেলেরা নিজেদের কি ভাবো? তোমাকে তো ১২ টা মামলা দিবে। একটা মামলা জামিন হতে পনের দিন লাগলে তো অনেক দিন জেল খাটতে হবে। তোমার ছাত্রজীবন তো শেষই হয়ে যাবে। তোমরা কি মনে করো, তোমরা জান্নাতে যাবে। জবাবে , আমি বললাম জান্নাতে যাবো কিনা সেটা আল্লাহই ঠিক করবেন , আমরাও চেষ্টা করে যাবো। বুঝতে পারি এরা আমার জন্য একটা অভিযোগ দাড় করাতে চাচ্ছে। পরে যে গ্র্রুপ গুলো আসে তাদেরকে আর জবাব না দিয়ে হাসতে থাকি। পরদিন আমাকে জেলে চালান দেওয়া হলো।
Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s