কেউ কি আমাকে শেখাবে?

আজকে টাউনের ভিতর একটা কাজে গিয়েছিলাম। সাধারণত দরকার না পড়লে দিনের বেলা টাউনে ঢুকি না। ফেরার পথে প্রচন্ড বৃষ্টি। একটা দোকানের সামনে দাড়িয়ে গাড়ির জন্য অপেক্ষা করছি। আর এসময় একটা কল আসলো। কথা বললাম। কথা বলার সময় পাশে একজন বৃদ্ধা এসে কিছু টাকা চাইলো। বৃদ্ধার বয়স অনেক বেশি। আমার পকেটে ভাঙতি টাকা না থাকায় , অপরাগতা প্রকাশ করলাম । টমটমে উঠতে যাবো , এমন সময় বৃদ্ধা বললে তাকেও সাথে নিয়ে যেতে, তার গাড়ি ভাড়া নেই, সাঈদ আর আমি দুজনে বৃদ্ধাকে টমটমে তুলে দিলাম, আর নিজেরাও উঠে পড়লাম।
জানতে পারলাম, বৃদ্ধার বয়স একশত বছরের কাছাকাছি। বৃটিশ, পাকিস্তান আর বাংলাদেশ , তিনটা আমলই দেখেছেন। তার দুটো ছেলে আছে, কিন্তু তাদের আলাদা সংসার। নাতি-পুতিও আছে। কিন্তু এই বয়সে বৃদ্ধার ভার নেওয়ার মতো একজন মানুষও নেই। উনার বাড়ি খরুলিয়া, কক্সবাজার টাউন থেকে প্রায় ১২-১৫ কি.মি. এর রাস্তা। এই পথ পাড়ি দিয়ে শহরে আসছেন, কারো কাছে যাকাত-ফিতরার টাকা পান কিনা দেখতে। এখন ফিরে যাচ্ছেন।
সকাল থেকেই আমার মন খারাপ ছিলো। কেন জানি না আজকে অনেক বেশি কবর জিয়ারত করতে মন চাইছিলো। টাউনে যাওয়ার আরেকটা কারণ সেটাও। বড় কবরস্থানে একবার ঘুরে আসবো। বৃষ্টির জন্য যাওয়া হয়নি। এই বৃদ্ধাকে দেখার পর নিজেকে খুব অসহায় মনে হলো। মানুষ প্রাণীটাই এমন। এমন একটা দিন ছিলো যেদিন এই বৃদ্ধার সব ছিলো, কিন্তু আজকে তার নিজের বলতে কেউ নেই। এমন কেউ নেই যে তার ভার নিবে। তার চিকন চিকন হাতগুলো, আর সামনের দিকে বেকে যাওয়া দেহটা, তার হাতের লাঠিটা , তার কাঁপা গলার কথা শুনে নিজেকে আরো বেশি অসহায় মনে হলো। সকালের চিন্তাটা আবারও চলে আসলো। মনে শুধু একটা শব্দই ঘুরপাক খাচ্ছে, মৃত্যু!!!
আজকে বেঁচে আছি, আমার চারপাশে কতো হিতাকংখী, বন্ধু , আত্মীয়-স্বজন। কতো মানুষের চোখে আমার জন্য ভালোবাসা দেখতে পাই। আমার মা-বাবার আমার জন্য কতো চিন্তা। আমার আশপাশের পরিবেশটা আমার জন্য কতো নমনীয়।
কিন্তু! কালকে যদি আমি মরে যাই, তাহলে কোথায় থাকবে এই বিশাল শুভাকাংক্ষীর লিস্ট। কবরের ঐ ঘরে একা একাই তো আমার থাকতে হবে তাই না।
অন্ধকারে থাকতে কেমন লাগে, বাতাস ছাড়া থাকতে কেমন লাগবে। কিলবিল করে যখন কিটগুলো আমার শরীরের পচাঁ মাংসগুলো খাবে তখন আমার কেমন লাগবে? মুনকার-নাকীর অনেক দূরের কথা, আমার পচেঁ যাওয়া হাড়ের ব্যথাটা সইতে পারবো কিনা?
মানুষের জীবনের নির্মম বাস্তবতা, এই মৃত্যু। পৃথিবীর মানুষগুলো আমাকে শেখালো অনেক কিছু। কিভাবে ভালো ব্ক্তৃতা দিতে হবে,জীবনে কিভাবে বন্ধুত্ব অর্জন করতে হবে, মা-বাবার প্রিয়পাত্র হওয়ার জন্য কি করতে হবে, কিভাবে সাফল্য পেতে হবে,কিভাবে বাঁচতে হবে । কিন্তু কেউ কি আমাকে শেখাবে, মৃত্যুর পরের একাকীত্বটা কিভাবে কাটানো যাবে? কেউ কি আমাকে জানাবে অন্ধকার ঐ ঘরে আলোর ব্যবস্থা কোত্থেকে হবে? অথবা, এই যে কীটের যন্ত্রণা, পঁচে যাওয়া হাড়ের ব্যথার দুর্দশার উপশম কি কেউ জানাতে পারবে?
হায়রে মানুষ , পৃথিবীর সবকিছুই চিনলি, কিন্তু নিজের ভালো চিনলি না।
আল্লাহ! তুমি সবাইকে মৃত্যুর পরের আযাব থেকে মুক্তি দিও। আমীন।
Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s