জীবন কেমন হওয়া চাই

 

 

10354158_10152637113308544_7849146355256035784_n

ফজরের পরে উঠে নামায পড়ে আবারও ঘুমালাম। এই অভ্যাসটা বেশ খারাপ একটা ফল দিচ্ছে। ২৪ ঘন্টার দিনগুলোতে ১৪ ঘন্টামতো সময়ও হাতে পাচ্ছিনা। ছোটবেলা থেকে ঘুমকাতুরে, তার উপর জেল থেকে বের হওয়ার পর থেকে রাতে ঘুমের সমস্যা হচ্ছে। সকালের ঘুমটা অনেকটাই বাধ্যতামূলক হয়ে গেলা যেনো। এরপর ঘুম থেকে উঠো , গোসল করো, খেয়েদেয়ে কলেজে যাও। এই মোটামুটি জীবন, তবে কয়েকদিন আগের একটা ঘটনা , যেটা অনেকদিন পরে দু’আঙগুল টাইপ করার জন্য অনেকটা বাধ্য করলো। আর তাছাড়া একটা লম্বা কাজে হাত দিয়েছি। এই লেখাটা হয়তো সেই লেখার জন্য ভুমিকা হয়েও যেতে পারে। যাইহোক, কলেজ গেইট দিয়ে ঢুকতে যাবো, এমন সময় কয়েকটা  ছেলে চোখে পড়লো। ইন্টারের ছেলে, আচরণ আর উচ্ছলতা দেখেই বোঝা যায়। তিনটা জ্বল-জ্যান্ত নায়কের বাচ্ছা যেনো। নায়কদের মিনিয়েচার কপি হলে তো নায়কের বাচ্ছায়ই হবে, তাই না। চুলের ভাজ( যদিও এখন আর ভাজ থাকে না,ভাজ না থাকাটাই এইসময়ের ট্রেন্ড), গায়ের কাপড় আর হাটার ভঙ্গী সবই নায়ক টাইপ। তাদের সাথে কথা বলার ইচ্ছা ছিলো, কিন্তু একজন ক্লাসমেটের সাথে দেখা হয়ে যাওয়ায় কথা না বলেই আমার ক্লাস ধরতে আমার ক্লাসমেটটার সাথে হাটা শুরু করলাম।  ক্লাসে মন বসাতে পারলাম না। এমনিতে আমি একটু ফাকিবাজ টাইপ, তার উপর  ক্লাসে মনোযোগ দেওয়ার মতো অনেক কিছুই মাথায় ঘুরছে। একটাই চিন্তা ঘুরছে মাথায়, আচ্ছা মানুষ অনুকরণ করে কেন? অথবা অনুকরণ করলেও, কাকে করব? কাকে আদর্শ মানবো?

এবার আসি আসল কথায়, মুসলিম তরুণদের সামনে আসলে এই প্রশ্নগুলোর যথার্থ উত্তর আছে কিনা, অথবা তাদের সামনে এমন কোন অনুকরণীয় আদর্শ আছে কিনা, যেটা তারা গ্রহণ করবে? উত্তর জনাটা জরুরী।

ছোটবেলায় কার্টুনের হেব্বি ভক্ত ছিলাম। এখনও আমার ছোট ভাইটার সাথে একসাথে বসে কার্টুন দেখি। ব্যাটম্যান, সুপারম্যান, স্পাইডারম্যান সব হতে মন চাইতো। টিপু সুলতান সিরিজ দেখার পর থেকে নিজেকে টিপু সুলতান বানানোর জন্য বাঁশের কঞ্চি কেটে তলোয়ার বানানো হতো। একটু বড় হয়ে যখন সাইমুম সিরিজ পেলাম, তখন আবার আহমদ মুসা নিজের জীবনের জন্য আদর্শ বলে মনে হতো থাকলো। যতোই বড় হতে থাকলাম ততই নতুন নতুন চরিত্র চোখের সামনে আসতে থাকলো, আর অনুকরণীয় আদর্শের সংখ্যাও বাড়তে থাকলো।

কিন্তু এইযে, অনুকরণ করতে চাওয়ার ইচ্ছা, এটার পিছনে ফিলসফিটা কি? অথবা মানুষ কি অনুকরণের উর্ধ্বে উঠতে পারবে? আশা করি আমরা একটা সমাধানে যেতে পারবো।

আমরা অনুকরণ কেন করি?

 

আঠারো শতকের দিকে ইংরেজ কবি এডওয়ার্ড ইয়ংএকটা প্রশ্ন তুলেছিলেন- If we were all born originals, why is it that so many die copies?

আসলেই তো, মানুষ জন্মগতভাবে মৌলিক স্বকীয় চরিত্র নিয়ে জন্ম গ্রহণ করলেও কেন বয়সের সাথে সাথে মানুষ অনুকরণপ্রিয় হয়ে উঠে?

এই প্রশ্ন উত্তর বিগত দুইশ বছর ধরে আমরা , বিশেষত মুসলিম এবং প্রাচ্যের তরুণরা খুজে ফিরেছি। পাশ্চাত্য, যে যান্ত্রিক সভ্যতা সৃষ্টি করেছে, সে যান্ত্রিক সভ্যতার ঝলমলে আলোয় আমাদের চক্ষু বিস্ফারিত রয়েই গেলো। পাশ্চাত্য অনুকরণের কারণে আমাদের জীবন প্রণালী বলতে মৌলিকভাবে আর কিছু রইলো না। পাশ্চাত্যের আচার ব্যবহার এখন আমাদের কাছে ভদ্রতার প্রতীক। এই ব্যাপারটা আমাদেরকে ভাবায়। চিন্তাশীল ব্যক্তিমাত্রই এই ব্যাপারে চিন্তিত।

সাধারণভাবে অনুকরণের অভ্যাসটা মানুষের জন্মগত। মানুষের ভাষা , আচার আচরণ শেখা সবই এই অনুকরণের মাধ্যমে।মোটকথা অনুকরণ জ্ঞানঅর্জনের সর্বপ্রথম উপায়।

 

দ্বিতীয়ত অনুকরণ হচ্ছে একটি শারীর বৃত্তিয় প্রক্রিয়া যেটা মানুষের স্নায়ুকোষ মানুষকে দিয়ে করায়।

 

তৃতীয়ত , অনুকরণ মানুষের মাঝে জ্ঞানের সমাবেশ করে বিধায় অনুকরণ সাথে সাথে আরেকটা জিনিস মানুষের মাঝে সৃষ্টি করে। তাহচ্ছে, আত্মবিশ্বাস। বিভিন্ন জটিল পরিস্থিতিতে, জঠিল পরিবেশে পূর্ববর্তীরা কি করেছেন, সেটা যদি জানা থাকে তাহলে মানুস আত্মবিশ্বাসী হতে পারে।

 

To be or not to be; That is the question

 

এই পর্যন্ত আমরা অনুকরন সংক্রান্ত যে আলোচনা করেছি সবগুলোই ইতিবাচক। আর অনুকরণ যদি মানুষকে উন্নতি দান করে যেতো তাহলে তো এতে খারাপ কিছু নাই।  অনুকরণ করে তো মানুষ তার কাংখিত উন্নতির দিকে এগুতে পারতো। কিন্তু সেটা তো সবক্ষেত্রে হচ্ছে না।

দেখা গেলো, আপনি একজন মানুষকে, অথবা একটি সভ্যতাকে সারাজীবন অনুকরণ করে গেলেন। মনে করলেন যে এদের সব ভালো, হঠাৎ একদিন খেয়াল করলেন যে এই লোকটা , এই সভ্যতা তাদের দীর্ঘদিনের একটা রীতিকে বাতিল করে দিলো। সেক্ষেত্রে আপনি, যে ব্যক্তি সে সম্প্রদায় বা সভ্যতাকে অনুকরণ করে গেলেন, সে তো রীতিমতো একটা বিরাট ধাক্কা খেলেন।

অথবা দেখা গেলো আপনি একটা জ্ঞানভান্ডারকে এতোদিন দরে নির্ভূল ধরে নিয়ে সেই জ্ঞানকে অনুকরণ করে গেলেন। একদিন খেয়াল করলেন, এতদিন যে জ্ঞানকে নির্ভূল ধরে নিয়েছিলেন সেটায় একটা বিরাট ফাক আছে। আপনার অবস্থা চিন্তা করুন। কি মানসিক যন্ত্রণায়ই না আপনি পড়বেন।

 

কাকে অনুকরণ করব?

 

এখন স্বাভাবিকভাবে একটা প্রশ্ন আসবে। অনুকরণ করলে কাকে করবো, কোন জিনিসকে জ্ঞানের ভিত্তি হিসেবে স্থাপন করবো?

এই প্রশ্নটার উত্তর তখনই আপনি পাবেন, যখন আপনার জীবনের লক্ষ্যটা আপনার কাছে স্পষ্ট থাকে। জীবনের লক্ষ্য বলতে আমি আপনাকে  AIM IN LIFE নামক রচনা লিখতে বলছি না। আমি এমন লক্ষ্যের কথা বলছি যেটা আপনার সামগ্রিক লক্ষ্যকে নিয়ন্ত্রণ করবে, একটা নির্দিষ্ট দিকে নিয়ে যাবে।

আপনার লক্ষ্যের গন্তব্য কি এই জগতে সীমাবদ্ধ নাকি সেটা অনন্তকালের জন্য নির্দিষ্ট? এই প্রশ্নটার উত্তর যদি আপনি ঠিকমতো খুজে পান তাহলে আপনার জন্য আদর্শ বাছাইয়ের  কাজটা সহজ হবে।

এখন , একজন মুসলিম হিসেবে , আপনার জীবনের লক্ষ্য হওয়া উচিত আল্লাহকে সন্তুষ্ট করা।

আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার একমাত্র উপায় হচ্ছে, আল্লাহর ইবাদাত করা। ইবাদাত মানে শুধু পাঁচওয়াক্ত নামাজ, রমাদ্বানের রোজা, যাকাত দেওয়া আর হজ্জ না কিন্তু!

ইবাদাত শব্দটার অর্থ অনেক ব্যাপক। বাংলায় এই শব্দের সঠিক কোন প্রতিশব্দ আমাদের জানা নেই। ইসলাম ইবাদাত বলতে যেই জিনিসটা দাবি করে সেটা পেতে হলে আপনাকে একটু কষ্ট করতেই হবে। আমরা এই শব্দটাকে এভাবে ব্যাখ্যা করি, আল্লাহ প্রদত্ত, রাসুল স. প্রদর্শিত জীবনবিধান অনুযায়ী ব্যক্তির সার্বিক জীবনের পুনর্বিন্যাস সাধন করা। সার্বিক কথাটাই মুখ্য, আপনি আপনার পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক জীবন , এককথায় জীবন পরিচালনার জন্য যে আচার-ব্যবহার, লেনদেন, প্রথা এবং নিয়মনীতি মানতে হয়, তার প্রত্যেকটিকে ইসলামের আলোকে ঢেলে সাজবেন, আরো সহজ করে বলতে গেলে আপনার জীবন হবে তাওহীদের উপর।

তো, এজন্য আপনাকে আবারো চলে যেতে হবে সে অনুকরণের তত্ত্বে। আরো একটু সুন্দরভাবে বলতে গেলে, অনুসরণ !

আর আপনার জন্য আল্লাহর রাসুল সা. হচ্ছেন উত্তম আদর্শ। রাসুল স.কে একটু অনুকরণ করতে চেষ্টা করুন না। খুব বেশি কষ্ট হলে, আপনি আরো একধাপ নিচে নামতে পারেন। রাসুলের সাহবী রাদিয়াল্লাহু আনহুম। তারা এমন ব্যক্তি যাদের উপর আল্লাহ সন্তুষ্ট। আরো আপনি অনুরকণ , অনুসরণ করতে পারেন ইসলামের ইতিহাসে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অসংখ্য মুসলিমদের, যাদের আচরণ এবং কর্ম আমাদের বর্তমান সভ্যতাকে আলোকিত করেছে।

 

আমি নিজেও উপরোক্ত ব্যক্তিদের ব্যাপারে খুব কম জানি, অথচ বর্তমান সময়ের অসংখ্য ব্যক্তি সম্পর্কে হয়তো অনেক কিছু বলতে পারবো। তবে , নিজের আসল জায়গাটায় যদি ফাকা থাকে তাহলে, কিন্তু শেষ বয়সে আমিও হয়তো নিজেকে প্রশ্ন করতে পারি To be or not to be; That is the question?

মুফতি ইসমাইল মেন্ক, ইমাম আনওয়ার আল আওলাকী আর নোমান আলী খানের লেকচার গুলো শুনে আমার কাছে মনে হয়েছে, ইসলামের স্বর্ণালী যুগের সেই সমস্ত নায়কদের, হিরোদের ব্যাপারে বিস্তর জানাটা খুব জরুরী।

আমার গন্তব্য একটা , নিজেকে পরিপূর্ণভাবে জানা। আর এই যাত্রাটা হয়তো একটু দীর্ঘই হবে , কিন্তু ফলাফলটা অসাধারণ হবে এতে কোন সন্দেহ নেই।

তাই, জীবন কেমন হওয়া উচিত, এই সম্পর্কে জানার জন্য, বুঝার জন্য আমাদের কর্মপ্র্রচেষ্টা অব্যাহত থাকুক।

একবার, চেষ্টা করে দেখুন না, আশাকরি খুব বেশি কষ্ট হবে না।

ফি আমানিল্লাহ।।।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s